গণিতের আদি কথা
গণিত পরিসর ও সংখ্যা সম্পর্কিত বিজ্ঞান। গণিত শাস্ত্রের প্রধান বিভাগগুলির মধ্যে রয়েছে জ্যামিতি, অঙ্কশাস্ত্র, বীজগণিত, ক্যালকুলাস এবং ত্রিকোণমিতি। পরিসংখ্যান, সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, গণনা, জ্যোতির্বিদ্যা, বিদ্যুত্, আলো, তাপ-গতিবিদ্যার গাণিতিক সূত্রসমূহ এবং পারমাণবিক বিদ্যা ফলিত গণিতশাস্ত্রের আওতাভুক্ত বিষয়।
প্রাগৈতিহাসিক মানব সম্ভবত তাদের হাতের আঙ্গুল থেকে কমপক্ষে দশ পর্যন্ত গুণতে শিখেছিল। চীনা, হিন্দু, ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয়গণ সকলেই তাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহারিক গুরুত্ব ছিল এমন গণনা ও পরিমাপ পদ্ধতির উদ্ভাবন করা। প্রথম তাত্ত্বিক গণিতবিদ ছিলেন মেলিটাস এর ‘থেলেস’ (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮০ অব্দ)। ধারণা করা হয় তিনিই সমতলের উপর অঙ্কিত চিত্রের জ্যামিতির প্রাথমিক সূত্রসমূহের প্রস্তাবনা রেখেছিলেন। তাঁর শিষ্য পিথাগোরাস গ্রীকগণের মধ্যে জ্যামিতিকে একটি স্বীকৃত বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে আলেকজান্ডারী যুগের জ্যামিতি শাস্ত্রবিদদের মধ্যে ছিলেন (খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ ও ৩য় শতক) ইউক্লিড এবং আর্কিমিডিস। বর্তমান দশ ভিত্তিক সংখ্যাসমূহের উত্পত্তি ও ব্যবহার হিন্দু-আরব অঞ্চল থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দে মধ্য প্রাচ্যের খাওয়ারিজমি-এর মতো আরব গণিতশাস্ত্রবিদদের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছেছিল। ভারতের (বঙ্গ অন্তর্ভুক্ত) গণিতশাস্ত্রের মূল উন্নয়নের ঘটনাটি ঘটেছিল ৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হাজার বছর সময় জুড়ে, যা ইতিহাসে বৌদ্ধ ও জৈনযুগ হিসেবে চিহ্নিত।
বৌদ্ধ ও জৈন যুগীয় গণিত (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-৫০০ খ্রিস্টাব্দ) বৌদ্ধ ও জৈনধর্মে গণিতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উভয় ধর্ম সমপ্রদায়ই গণিত গবেষণার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছিল। জৈনরা গণিত চর্চাকে ধর্মচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করত। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গণিত বিষয়ক কোনো গবেষণাকর্মের তেমন কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও তাঁদের ধর্মীয় সাহিত্যে গণিত বিষয়ক অনেকগুলি ধারণা ও উপাদান ব্যাপকভাবে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে। অনুরূপভাবে, গাণিতিক উপাদান বিষয়ে যে কোনো ঐতিহাসিক আলোচনায় সূর্য্যপ্রজ্ঞাপ্তি (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), চন্দ্রপ্রজ্ঞাপ্তি (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), জম্বুদ্বীপপ্রজ্ঞাপ্তি (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), স্থানাঙ্গ-সূত্র (৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), সমভয়াঙ্গ-সূত্র (৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), ভগবতী-সূত্র (৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), অনুযোগদ্বার-সূত্র (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), ললিতবিস্তার (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), কাক্কয়ানাসের পালি ব্যাকরণ (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), তত্ত্বার্থধিগম-সূত্র ও ঊমাস্বতী কর্তৃক-এর ভাষ্য (১০০ খ্রিস্টাব্দ), পুষ্পদানাত ও ভূতাবলির সাতখন্ডগম (২০০ খ্রিস্টাব্দ), ভাতিভ্রসবের ত্রিলোকপ্রজ্ঞাপ্তি (৫০০ খ্রিস্টাব্দ) ইত্যাদি গুরুত্বের সঙ্গেই চলে আসে।
স্থানাঙ্গ-সূত্র অনুযায়ী গণিতের বিষয় হলো দশটি: পরিকর্ম (চারটি মৌলিক ক্রিয়াপদ্ধতি), ব্যবহার (প্রয়োগের বিষয়), রজ্জু (জ্যামিতি), রশি (কঠিন পদার্থ পরিমাপন প্রক্রিয়া), কলাসবর্ণ (ভগ্নাংশসমূহ), যাবত্-তাবত্ (সরল সমীকরণ), বর্গ (দ্বিঘাত সমীকরণ), ঘন (ত্রিঘাত সমীকরণ), বর্গ-বর্গ (চতুর্ঘাত সমীকরণ), এবং বিকল্প (বিন্যাস ও সমাবেশ)। অবশ্য অভয়াদেব সুরী (১০৫০ খ্রিস্টাব্দ) প্রদত্ত কতিপয় পরিভাষা বা তাঁর ব্যাখ্যার সঙ্গে কোনো কোনো গণিত বিষয়ক ঐতিহাসিক দ্বিমত পোষণ করে থাকেন। বৌদ্ধদের ললিতবিস্তার (১০০ খ্রিস্টপূর্ব) শততমিক মানের ওপর ভিত্তি করে কোটি, অযুত, নিযুত থেকে তাল্লক্ষ্মণ = ১০৫৩ ইত্যাদি সংখ্যাক্রম সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কাক্কয়ানদের পালি ব্যাকরণেও একটি সংখ্যাক্রম পরিবেশিত হয় যেটির শেষ সংখ্যা হলো অসংখ্যেয় = ১০১৪০। জৈনরা আরও এক ধাপ এগিয়ে শীর্ষ প্রহেলিকা = (৮৪০০০০০০)২৮ পর্যন্ত সংখ্যা গণনা ও নামকরণ করে এবং একই সময়কালে এর দ্বিতীয়টি ছিল কালক্রম বিষয়ক - পূর্ব = ৭৬ ´১০১১ বছর। উল্লিখিত সংখ্যা-নাম ও অন্যান্য ইতিবাচক সাক্ষ্যসমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, খ্রিস্টীয় যুগ সূচনার পূর্ব থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে স্থানীয় মান ও শূন্যসহ দশমিক সংখ্যা গণনার পদ্ধতি জানা ছিল। সংক্ষেপিত
সূত্র: বাংলাপিডিয়া
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন